‘অধ্যয়নরত’ আর ‘শিক্ষিত বেকার’ এর অর্থ না বুঝে জ্ঞানীর কথায় জ্ঞানপাপীদের অপব্যাখ্যা!

32

বার্তা পরিবেশক ::
সে অনেক আগের কথা। আমাদের গ্রামে এক বৃদ্ধ বধির লোক ছিলেন। তিনি এমন বধির ছিলেন যে, কানের পাশ দিয়ে মাইক বাজলেও ঠিকমত শুনতেননা! কেউ ওনার সামনে গিয়ে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে, ওনি উত্তর দিতেন, “ওয়ালাইকুমুচ্ছালাম!” অন্যের বলা আর নিজের বুঝার মধ্যে সমস্যা হলে যেমনটি হয়।

লেখাপড়া না জানা মায়ের উচ্চ শিক্ষিত ছেলে মৃত্যুশয্যায় তার মায়ের কাছে পানি চাইতে গিয়ে পানির পরিবর্তে ‘ওয়াটার, ওয়াটার’ বলে ব্যাপক আকুতি জানালেও মায়ের কাছে ‘ওয়াটার’ শব্দের অর্থ জানা ছিলনা বলে মৃত্যুর সময় ছেলেকে পানি পান করাতে না পারার মত হৃদয় বিদারক গল্পও আমরা শুনেছি। এটা নিছক-ই গল্প হলেও শব্দের অর্থ না বুঝার কারনে কখনোকখনো যে বড়সড় ট্র্যাজেডির জন্ম হয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

আজ আমাদের সমাজের কিছু মানুষের অবস্থাও হয়েছে সেই নাফাইঙ্গা (বধির) বুইজ্জার মত! একজনে বলেন এক, আর ওনারা শুনেন আরেক। অন্যের বলা ভাল কথাগুলোকে বিকৃত করে ভিন্নভাবে প্রচার করাই তাদের স্বভাব। হতে পারে এটা তাদের অর্থ না বুঝার অজ্ঞতা কিংবা হতে পারে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

এই যেমন, অতিসম্প্রতি উখিয়া উপজেলা পরিষদের সম্মানীত চেয়ারম্যান, উখিয়া বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছামুজিব মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবং উপজেলা আওয়ামীলীগের সুযোগ্য সভাপতি জনাব অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী ব্র্যাক এনজিও কর্তৃক আয়োজিত এক সভায় রোহিঙ্গাদের আগমনের পর এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে তা থেকে মুক্তি লাভের জন্য তিনি স্কুল, কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে অনভিপ্রেতভাবে চাকরীর প্রতি ঝুঁকে পড়ার যৌক্তিক বিরোধীতা করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ওনার মত একজন জ্ঞানীর কথাটি উখিয়ার কিছুসংখ্যক জ্ঞানপাপীদের জ্ঞানের অগভীরতার কারনে তাদের জ্ঞানইন্দ্রিয়ে অনুভূত হয়নি! তাঁর পুরো বক্তব্য থেকে ভাল কথাগুলোকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক কিংবা অন্যকোন হীন স্বার্থে তাঁকে বিতর্কিত করতে কেবল অাংশিক উক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা করছেন এবং সেই সাথে সময়ের প্রয়োজনে তাঁর দেওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের মূল উদ্দ্যেশ্যকেও আড়াল করার প্রয়াস করছেন। যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উপর আরো বেশি ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর বক্তব্যকে বিকৃত করে সমালোচনা করার আগে একটিবার এটা ভাবা উচিত ছিল যে, বক্তব্য প্রদানকারী ব্যক্তিটি কেবল একজন রাজনীতিবিদ কিংবা জনপ্রতিনিধি নন, তিনি একজন শিক্ষকও। তাই সঙ্গতকারনে শিক্ষার্থীর সুন্দর ভবিষ্যত সম্পর্কে তাঁর দরদ বেশি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কারন, একজন শিক্ষকের কাছে প্রতিটি শিক্ষার্থী তাঁর সন্তানতূল্য। তাই একজন শিক্ষক হিসেবে সেই সন্তানতূল্য শিক্ষার্থীর ভালমন্দ সম্পর্কে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাঁর রয়েছে।

কোন না কোনভাবে সম্মানীত উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের সেদিনের বক্তব্যের অাদ্যোপান্ত এবং বক্তব্যের প্রকৃত উদ্দ্যেশ্য সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। তাই আমি হলফ করে বলতে পারি, তিনি সেদিন তাঁর বক্তব্যে এলাকার শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়দের চাকরীর প্রয়োজনীয়তার বিরোধীতা করে কোন বক্তব্য প্রদান করেননি। করেছেন, অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের চাকরী ব্যাপারে। তিনি এও অাশংকা প্রকাশ করেন যে, উখিয়ার বিভিন্ন স্কু্ল, কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার রিগুলারিটি নষ্ট করে কিংবা লেখাপড়া বাদ দিয়ে যে হারে এনজিও’র চাকরীর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, তাতে করে কোন একসময় আমাদের উখিয়া মেধাশূণ্য হয়ে যেতে পারে। তাই তিনি নিজ এলাকাকে মেধাশূণ্য হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে অধ্যয়নরত কোন ছাত্র-ছাত্রীকে চাকরীতে না নিতে কিংবা এমন কেউ চাকরীতে থাকলে তাদের ছাটাই করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু যারা তাঁর এই সময়োপযোগী বক্তব্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করছেন, তাদের কেউ কি যুক্তি দিয়ে বলতে পারবেন, তাঁর এই কথা অযৌক্তিক? স্কুল, কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে অসময়ে চাকরীর পেছনে না ঘুরে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হতে বলাটা কি তাঁর অপরাধ ছিল? যাদের কাছে তাঁর এই সময়োপযোগী বক্তব্য এলাকার স্বার্থ বিরোধী বলে মনে হয় আমার কাছে তাদেরকে বরং এলাকার বর্তমান এবং ভবিষ্যত শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে অদূরদর্শী বলে মনে হয়। কেননা, রোহিঙ্গা আসার পর থেকে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার রিগুলারিটি ভঙ্গ করে যেভাবে এনজিওর অস্থায়ী চাকরীর পেছনে সময় দিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার এবং সম্ভাবনাময়ী ভবিষ্যত নষ্ট করছে, তাতে তাঁর সাথে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, অদূরভবিষ্যতে আমাদের এলাকা সত্যিই মেধাশূণ্য হয়ে যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতির হার কমে গেছে উদ্বেগজনকভাবে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত যে অন্ধকার সেকথা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

রোহিঙ্গারা কিন্তু এই দেশে চিরদিন থাকবেনা। আজ যারা লেখাপড়া বাদ দিয়ে টাকার লোভে নিজেদের সম্ভাবনাময়ী ভবিষ্যত নষ্ট করছে, রোহিঙ্গা চলে গেলে তাদের কি অবস্থা হবে? তাছাড়া, এইসব চাকরী স্থায়ীও নয়। তিনমাস, ছয়মাস কিংবা বড়জোর একবছরের চুক্তিভিত্তিক। যদি সেই টাকার লোভ না করে লেখাপড়া সম্পন্ন করে নিজেকে যোগ্য হিসেবে তৈরী করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে স্থায়ী চাকরী পেতে কোন সমস্যা হবে বলেও মনে হয়না। সেই উপলব্ধি থেকে জনাব অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের চাকরীর ব্যাপারে নিজের অনীহার কথা বলেছেন। যেটা খুবই যুক্তিসংগত এবং সময়োপযোগী। অথচ, আমাদেরই কিছু মানুষ তাঁর এই বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তাঁকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। যা খুবই অনভিপ্রেত।

আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে ওভার ফাইনান্সিং বলে একটা বিষয় আছে। কোন ব্যবসায়ীর স্টক, সম্পদ, সামর্থ্য এবং প্রয়োজনীয়তার অতিরিক্ত বেশি টাকা ফাইনান্স করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফান্ড ডাইভার্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং সেটা হয়ও। ফলে একসময় সেই ব্যবসায়ী ডিফল্ডারের খাতায় নাম লেখান। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যরত এনজিওগুলোও আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ওভার মূল্যায়ণে নেমেছে বলে মনে হয়। এটার ভবিষ্যত খুবই খারাপ। যেমন, বিশহাজার টাকা বেতনের চাকরী পাওয়ার যোগ্যতাও যার নাই, তাকে বেতন দেওয়া হচ্ছে পঞ্চাশ হাজার টাকা। সব টাকা যে তারা পরিবার কিংবা অন্যকোন ভাল কাজে ব্যবহার করছে তা কিন্তু নয়। এই অতিরিক্ত টাকা তাদের খারাপের দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ টাকা হয়ে গেলে কিছু মানুষ যেরকমভাবে অন্যায়, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে, আমাদের ছেলেমেয়েদের অবস্থাও আজ তাই। অনেকে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে এমন খবরও আমরা শুনছি এবং তারা দিনদিন ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। যদি তাদেরকে বড় অঙ্কের এই অযৌক্তিক বেতন দেওয়া না হত, তাহলে লেখাপড়া বাদ দিয়ে অস্থায়ী চাকরীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজদের সম্ভাবনাময়ী ভবিষ্যতটাকে নষ্ট করতনা।

আমি সুনিশ্চিতভাবে জেনেছি, তিনিও উখিয়ার শিক্ষিত বেকারদের চাকরী পাওয়ার অধিকারের পক্ষে। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত যুক্তিসংগত কারনে তিনি অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে অস্থায়ী চাকরীতে সময় দিয়ে ভবিষ্যত নষ্ট করার ঘোর বিরোধী। তিনি বলেছেন, অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের চাকরীর দরকার নাই। আর জ্ঞানপাপী পন্ডিতরা বুঝে নিলেন, তিনি নাকি বলেছেন, উখিয়ার ছেলেমেয়দের চাকরীর প্রয়োজন নেই! আসলে আমাদের সমস্যাটা বুঝার মধ্যে। আমরা শিক্ষিত বেকার এবং অধ্যয়নরত এই দুই শব্দের পার্থক্য বুঝতে পারিনা। যদি বুঝার মত জ্ঞান থাকত, তাহলে আজকে যারা তাঁর বক্তব্যের বিরোধীতা করছেন, তারা অবশ্যই তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করতেন।

তিলকে তাল করার মত এই বিষয়টা নিয়ে আমার একটি নির্ভুল অবজারবেশন এই যে, সুনির্দিষ্ট একটি পক্ষ বা সুনির্দিষ্ট ক’জনমাত্র ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যকে বিকৃত করে যুবসমাজকে দিয়ে এটি ভাইরাল করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাচ্ছেন বা তাঁকে রাজনীতিক কিংবা জনপ্রতিনিধি হিসেবে অযোগ্য এবং অদূরদর্শী হিসেবে প্রমাণ করতে চাচ্ছেন। হুজুগে বাঙ্গালীর দেশে এসব নির্বাচনের আগ মুহুর্তে করলে কিছুটা ফল পাওয়া যেত। কিন্তু সেই নির্বাচন যে আরো বহুদূর!

যা-ই হউক, অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরীর মত আমরাও আমাদের অধিকারের পক্ষে। আমরাও চাই, আমাদের শিক্ষিত বেকারদের চাকরী হউক। কিন্তু যে চাকরী অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে তাদের সম্ভাবনাময়ী ভবিষ্যত নষ্ট করে তেমন চাকরীর অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলনের সারথী আমরা নই। আগে শিক্ষা, পরে কর্ম। তাই অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের আগে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ দিন। শিক্ষার যোগ্যতা অর্জন করতে পারলে চাকরীতে তাদের পেছনে দৌঁড়াবে। এজন্য মিছেমিছি কাউকে বলির পাঁঠা বানিয়ে বেকার যুবকদের কাছে নিজেকে হিরো বানানোর দরকার নেই। মনে রাখতে হবে, সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষের উছকানিতে কাউকে মিথ্যা অপবাদে অপমান, অসম্মান আর লাঞ্চিত করে সার্বজনীন অধিকার আদায় করা যায়না। আমি যতদূর জানি, তিনিও এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের চাকরী পাওয়ার অধিকারের পক্ষে। এনজিওদের সাথে আঁতাত করে নিজ এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি করার লোক তিনি নন। তাই নিজেদের প্রয়োজনে অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরীর মত মেধাবী মানুষকে কাজে লাগান। আমি নিশ্চিত, অধিকার আদায় হবেই। কথার প্রকৃত অর্থ না বুঝে অন্যের কথায় চিলে কান নিয়েছে বলে চিলের পেছনে দৌঁড়ানো কিন্তু কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
তাই অযথা সমালোচনা পরিহার করে আমাদের সম্মানীত উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করি।

সংবাদটি আপনার ফেইসবুকে শেয়ার করুন…

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here